কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নৌ পথে ভ্রমণ, সমুদ্র-সৈকত

সাগর জলে পা : সেন্টমার্টিন সাগর সৈকত

St. Martin's Beach

সাগর জলে পা : সেন্টমার্টিন সাগর সৈকত

আফরোজা অদিতি

সাগর জলে পা : সেন্টমার্টিন সাগর সৈকত

২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি তারিখে রাতের বাসে সেন্টমার্টিন যাবো। পারিবারিক ভ্রমণ। টিকিট করা ছিল, হোটেল বুকিং ছিল।

ওই দিন আমাদের ভুতুন সোনা (রাহগীর, ছেলের ছেলে)-র জন্মদিন ছিল। সকালে গেলাম ও বাড়িতে। ওখান থেকে এসে, আমরা যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।

রাস্তার অবস্থা খাবাপ, যানজট, রাস্তা বন্ধ। সব মিলিয়ে এলাহী কাণ্ড। তাই একটু আগে আগে রওয়ানা করলাম।

আমার কখনো অপেক্ষা করতে ভালো লাগে না। এই জন্য মাঝেমধ্যেই ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে যাই। তর্ক করতে করতে রেগে যাই। বয়সের রোগ এটা।

রাগ হলেই কান্না, দুই চোখ সাগর হয়ে জোয়ারে ভাসে। অদ্ভুত! অহেতুক তর্ক করা ঠিক নয়, তবুও তর্কে জড়িয়ে যাই! আমার এ অপারগতা ক্ষমা করো ঈশ্বর!

যাক সে-কথা। আমরা বাস কাউন্টারে পৌঁছালাম রাত ৮.৩০-এর দিকে। বাসের নাম সেন্টমার্টিন পরিবহন। কেয়ারি থেকে টিকিট কাটা হয়েছে।

বাস আর জাহাজের আসা-যাওয়া। বাস জাহাজ ঘাটে পৌঁছে দিবে, আবার জাহাজ ঘাট থেকে নিয়ে আসবে।

আমরা টেকনাফ পৌঁছালাম সকালে। টেকনাফ থেকে জাহাজ ছাড়বে সকাল ৯টায়, ওপারে পৌঁছে দিবে ৩টায়।

জাহাজে উঠে পাউরুটি, ডিম পোচ, ভাজি, আর চা খেলাম। জার্নিতে চা অমৃত সমান! খেতে খুবই ভালো লাগে!

.

সাগরে জাহাজ ভ্রমণ খুবই ভালো লেগেছে। সি-গাল উড়ছে, জেলে নৌকা থেকে জেলেরা মাছ ধরার জাল ফেলেছে, কোথাও টেনে তুলছে। উড়ছে সি-গাল। সাদা কালো ধুসর এই রঙের মিশ্রনে এই বিহঙ্গরা দল বেঁধে ওড়ে।

উড়তে উড়তে এমনভাবে জলের বুক ছুঁয়ে যায় সেটাও দেখার মতো। জলের বুক ছুঁয়েই বসে পড়ে জলের ওপর কোনো কোনোটি। ভাসতে থাকে হাঁসের মতো। চোখে লেগে আছে, লেগে থাকবেও আমরণ।

জলের খেলা, সি-গালের নাচানাচি দেখতে দেখতে চলছি। নাফ নদী থেকে জাহাজ সাগর পেরিয়ে সেন্টমার্টিন দারুচিনি দ্বীপে নামিয়ে দিলো।

জাহাজ হেললো, দুললো নাচানাচি করলো; কখনো হাসালো কখনো নাচালো। তার পর জাহাজ, ক্রুজ অ্যাণ্ড ডাইনিং নামিয়ে দিলো ১২টার দিকে।

টেকনাফ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেন্টমার্টিন একটি প্রবাল দ্বীপ। শুধু বিভিন্ন প্রজাতির প্রবাল নয়, এই দ্বীপে আরো আছে—বিভিন্ন প্রজাতির শামুক-ঝিনুক-মাছ-পাখি।

সেন্টমার্টিনের স্থানীয় নাম ‘নারকেল জিঞ্জিরা’। এই দ্বীপের আয়োতন প্রায় আট বর্গকিলোমিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে লম্বা।

বাংলা, আরাকান ও বার্মা যখন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে আসে, তখন সাধু মি. মার্টিনের নামানুসারে এই দ্বীপের নামকরণ হয়ে যায় সেন্টমার্টিন। তবে অনেকে মনে করেন, এটা ঠিক নয়। কারণ এই দ্বীপে কোনো খিস্টান বসতি এবং গির্জা নাই।

.

নব্বইয়ের দশকে আরেকবার এসেছিলাম টেকনাফ। সে-সময় কক্সবাজার থেকে টেকনাফ এসেছিলাম চান্দের গাড়িতে। চান্দের গাড়িতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম, এসেছিলাম। যেতে-আসতে ভালোই লেগেছিল।

সবুজে ঘেরা পাহাড়ের গা ঘেঁষে রাস্তা আর নাফ নদীর কলতান। সে-সময় বয়স কম ছিল। নাফ নদীর তীরে বসে নদীজলের কাছাকাছি কান লাগিয়েছিলাম এবং শুনেছিলাম জলের কলতান!

নাফ নদীর এতো সুন্দর কলতান, এখনো শ্রবণে গেঁথে আছে পুতির মালার মতো। খুব খুব ভালো লেগেছিল।

নাফ নদীকে বলা হতো ‘নে-রাই’ অর্থাৎ দেবতার নদী। এই নদী কলতান এতো মিষ্টি-সুন্দর বলেই হয়তো একে দেবতার নদী বলা হয়।

নদীর কলতান, সবুজে ঘেরা পাহাড় ছাড়াও টেকনাফের আরো একটি আকর্ষণ ‘মাথিনের কুপ’।

এই কুপটি টেকনাফ থানা প্রাঙ্গনে অবস্থিত একটি সাধারণ পাতকুয়া। সুপেয় খাবার জল সংগ্রহের জন্য এই থানা প্রাঙ্গনে কুয়াটি খনন করা হয়।

মাথিন ছিলেন মগকন্যা; রাখাইনদের মধ্যে তাঁর বাবা ছিলেন অবস্থাপন্ন। মাথিন ছিলেন তাঁর আদুরে কন্যা। মাথিন অন্য মেয়েদের সঙ্গে এই কুয়া থেকে পানি নিতে আসতেন।

সেই সময় মাথিনের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজের গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। তবে এই প্রেম মিলনাত্মক না-হয়ে বিয়োগান্তের রূপ নেয়।

এই বিয়োগান্ত প্রেমের স্বাক্ষর বয়ে চলেছে এই ‘মাথিনের কুপ’। এই প্রেম-স্মারকটি দেখতেই পর্যটকরা ভিড় করে এখানে।

.

আমরা সেন্টমার্টিন নেমে হোটেলে উঠলাম। রূম আগেই বুকিং দেওয়া ছিল। ফ্রেশ হয়ে খেতে নামলাম। তার পর সি-বিচ। সি-বিচ সুন্দর। নীল পানি। দূর থেকে জাহাজ আসছে যাচ্ছে। ঢেউ আছড়ে পড়ছে বিচের বালিতে।

সন্ধ্যায় ফিরে এলাম। খেতে গেলাম পাশের এক হোটেলে। মাছের বারবিকিউ। বিশাল বিশাল চিংড়ি, ভেটকি, স্যামন-সহ আরো মাছ সাজিয়ে রেখেছে।

পছন্দ মতো মাছের কথা বললেই বারবিকিউ করে দিচ্ছে ওরা। হোটেলে ফিরলাম ক্লান্ত হয়ে, ঘুমিয়ে গেলাম অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই।

সকালে সূর্যোদয় দেখব। যে হোটেলে ছিলাম ওখানে বসেই সূর্যোদয় দেখা যায়্। দোলনা টাঙানো আছে, আছে একটা নৌকা।

আমি আর আমার বড় মেয়ে নৌকা আর দোলনায় বসে সূর্যোদয় দেখলাম, ভিডিও করলাম। খুবই সুন্দর, নান্দনিক।

সাগরের ভেতর থেকে বেলুনের মতো উঠে আসে সূর্য। প্রথমে সাদা, তার পর আস্তে আস্তে রঙে রঙে রঙিন হয়ে উদয় হয় আমাদের পৃথিবীর তমসাহরণকারী সূর্যদেব।

সাগরজলে সূর্যদেবের উজ্জ্বল মূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল, প্রাণের গভীরে ঐ দৃশ্য এঁকে নিলাম।

তার পর দশটার দিকে গেলাম সাগরের অন্যদিকে। বিশাল বিশাল প্রবাল পাথর। তখনো জল জমেনি প্রবালের আশেপাশে। জোয়ার এলে জমবে জল।

সৈকতের পাশে কেয়াবনের সারি। আমরা যেখানে ছিলাম, সেখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে লেখক হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি ‘সমুদ্র বিলাস’ অবস্থিত।

মনে পড়ল, আমরা যখন রাঙ্গামাটি গিয়েছিলাম, তখন চলতি পথে একটি বাড়ির গায়ে বড় বড় হরফে লেখা ছিল ‘হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি বিজড়িত’।

কাউকে জিজ্ঞেস করিনি, তবে লেখাটি দেখে আমার মনে হয়েছে, ভালো কিছু সৃষ্টি করতে গেলে নির্জন কোনো স্থানে সব বন্ধন আপাতত বিচ্ছিন্ন করে নিবিষ্ট মনে সেই কাজটি করেন সৃজক;

লেখক হুমায়ূন আহমেদও হয়তো এই বাড়িটি বেছে নিয়েছিলেন তাঁর মূল্যবান সৃষ্টির জন্য!

এটি আমার ভাবনার কথা, কারণ এসব দেখে মনে হয়েছে—এমন সুন্দর জায়গা, এখানে থাকলে লেখা তো হবেই।

তবে আমার লেখা হবে কি-না জানি না, আমি শুধু জানি নয় বিশ্বাস করি, সবার সবকিছু হয় না!

.

যেদিন ফিরলাম, সেদিন জাহাজ ছাড়ার অনেক আগেই জাহাজের কাছে পৌঁছে গেলাম। এক জাহাজের ভেতর দিয়ে আমাদের জন্য নির্ধারিত জাহাজে গিয়ে উঠলাম।

বিকেল তিনটায় জাহাজ ছাড়ার কথা, কিন্তু দেরি হচ্ছিল, কারণ আমাদের জাহাজ ছাড়ার আগে অন্য একটি জাহাজ ছেড়েছিল সেটি যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য আটকে আছে সাগর জলে।

পরে দেখলাম-শুনলাম ঐ জাহাজটিকে; ঐ জাহাজের অতোগুলো যাত্রীকে তো ফেলে আসা যায় না, সে জন্য আমাদের জাহাজ সেটাকে নিজের সঙ্গে বেঁধে রওয়ানা হলো।

সমুদ্রের ঢেউয়ের দোলায় আর বাঁধা জাহাজের ধাক্কায় মাঝেমাঝেই কাত হয়ে পড়ছিল আমাদের জাহাজ। ভীত যাত্রীরা।

আমার বড় মেয়ে খুব ভয় পেয়েছিল। মেজ মেয়ে ভয় পায়নি, ছোটটিকে বুঝা গেল না ভয় পেয়েছে কী পায়নি।

আমি অবশ্য ভয় পাইনি। কারণ যখন ডাক আসবে, সময় হবে যাবার, তখন যেখানেই থাকা যাক না কেন, সে ডাক মর্মে এসে পৌঁছুবেই।

কথায় আছে ‘যার মৃত্যু যেখানে, পায়ে হেঁটে যায় সেখানে’ এবং জীবন আর মৃত্যু হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটে। তাই ভয় পাবার কিছু নেই।

অসময়ে চলে গেলে অনেক কাজ থেকে যায় অসম্পূর্ণ। অবশ্য একজন মানুষ তাঁর সব কাজ শেষ করতেও পারে না; বিশেষ করে শেষ যাত্রার কাজ।

এই কাজটির জন্য অন্যর কাছে ঋণী থাকতে হয়; আমারও থাকবে, তাই এই ঋণ যেন ক্ষমা করেন ঈশ্বর এইটুকু শুধু প্রার্থনা।

তবে আনন্দ আর মৃত্যুভয় সব মিলিয়ে সেন্টমার্টিন বেড়ানো আনন্দদায়ক হয়েছিল।

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

আফরোজা অদিতির পাঁচটি কবিতা

গল্প

রাত ভোর হতে আর কত দেরি

মুক্তগদ্য

অর্থ এক বিলাসী প্রেমিক

ভ্রমণ

গোকুল মেধ বা বেহুলার বাসরঘর

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণকথা

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণকথা – ২য় পর্ব

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও রাণী রাসমণি

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও রাণী রাসমণি – ২য় পর্ব

সাগর জলে পা

কুয়াকাটা সাগর সৈকত

সেন্টমার্টিন সাগর সৈকত

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

Spread the love

২ thoughts on “সাগর জলে পা : সেন্টমার্টিন সাগর সৈকত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *